কম্পিউটার ক্রমবিকাশের ইতিহাস, প্রজন্ম || ব্যাংকিং ডিপ্লোমা, আইটি (AIBB IT)
কম্পিউটারের ক্রমবিকাশের ইতিহাস বলতে গণনার প্রাথমিক যন্ত্র থেকে শুরু করে আধুনিক ডিজিটাল কম্পিউটার পর্যন্ত প্রযুক্তিগত উন্নয়নের ধারাবাহিকতাকে বোঝায়।
মূলত, কম্পিউটার হল এমন একটি ইলেকট্রনিক ডিভাইস (Hardware), যা মানুষ্য প্রদত্ত যুক্তি এবং সূত্র (Programme, Software) ব্যবহার করে মানুষের সরবরাহকৃত উপাত্ত-তথ্য দ্রুত এবং নির্ভুলভাবে প্রক্রিয়াকরণ করে এবং সুনির্দিষ্ট ফলাফল প্রদান করে থাকে। এই ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়ে থাকে।
কম্পিউটার মানবসভ্যতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার। বর্তমান যুগে শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যবসা-বাণিজ্য, গবেষণা, যোগাযোগ, ব্যাংকিং এবং প্রশাসনসহ প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে কম্পিউটারের ব্যবহার অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। তবে আধুনিক কম্পিউটার একদিনে তৈরি হয়নি। গণনার সহজ পদ্ধতি আবিষ্কারের প্রয়োজন থেকেই কম্পিউটারের ক্রমবিকাশ শুরু হয়।
প্রাচীনকালে মানুষ গণনার জন্য আঙুল, পাথর, দাগ বা গণনাযন্ত্র ব্যবহার করত। পরবর্তীতে অ্যাবাকাস, প্যাসক্যালাইন, ডিফারেন্স ইঞ্জিন, অ্যানালিটিক্যাল ইঞ্জিনসহ বিভিন্ন যন্ত্র আবিষ্কারের মাধ্যমে কম্পিউটার প্রযুক্তির উন্নয়ন ঘটতে থাকে। সময়ের সাথে সাথে ভ্যাকুয়াম টিউব, ট্রানজিস্টর, ইন্টিগ্রেটেড সার্কিট এবং মাইক্রোপ্রসেসর আবিষ্কারের ফলে কম্পিউটার আরও দ্রুত, ছোট, শক্তিশালী ও নির্ভরযোগ্য হয়ে ওঠে।
কম্পিউটার ক্রমবিকাশের ইতিহাস: ব্যাংকিং ডিপ্লোমা, আইটি (AIBB IT)
কম্পিউটার বহু বছরের গবেষণার ফল। কম্পিউটারের ক্রমবিকাশ শুরু হয় বিভিন্ন জগৎ বিখ্যাত গনিতবিদদের হাত ধরে। তাদের মধ্যে যাদের অবদান উল্লেখযোগ্য তারা হলেন John Napier (১৫৫০ – ১৬১৭), Blasé Pascal (১৬৪২) এবং Leibniz (১৬৭১)। এসকল গনিতবিদদের অগ্রগতি ছিল বিভিন্ন গণনাকারী যন্ত্র আবিস্কারের মাধ্যমে।
Charles Babbage (১৭৯২ – ১৮৭১), ইংল্যান্ডের একজন প্রখ্যাত গণিতবিদ, ১৮২১ সালে “ডিফারেন্স ইঞ্জিন” তৈরি করেন। এর কয়েকবছর পর ১৮৩৩ সালে, তিনি “অ্যানালিটিক্যাল ইঞ্জিন” নামে আরেকটি গণনাকারী যন্ত্র তৈরি করতে শুরু করেন, কিন্তু মৃত্যুর আগে এটি তিনি সম্পূর্ণ করতে পারেননি। তার বিশ্লেষণাত্মক “অ্যানালিটিক্যাল ইঞ্জিন” এর নকশা আধুনিক কম্পিউটারের ভিত্তি। এই কারণেই চার্লস ব্যাবেজকে “কম্পিউটারের জনক” বলা হয়।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অধ্যাপক D. John Atanasoff ১৯৪২ সালে ভ্যাকুয়াম টিউব ব্যবহার করে “ABC” নামে একটি ইলেকট্রনিক কম্পিউটার তৈরি করেন।
পরবর্তীতে ১৯৪৬ সালে, অধ্যাপক Dr. John Mauchly এবং তার ছাত্র Engr. Presper যৌথভাবে ENIAC (যা ছিল “Electronic Numerical Integrator and Computer”) নামে একটি কম্পিউটার তৈরি করেন।
এই কম্পিউটারটি প্রস্তুত করতে ১৮০০ ভ্যাকুয়াম ভাল্ব প্রয়োজন হয়েছিল, যার ওজন ছিল ৩০ টন এবং কম্পিউটারটি পরচিালনার জন্য ১৫০ কিলোওয়াট বৈদ্যুতিক লোডের প্রয়োজন হয়েছিল।
এই দুই বিজ্ঞানী তাদের গবেষনা বেগবান রাখেন এবং ১৯৫১ সালে UNIVAC (Universal Automatic Calculator) নামে আরেকটি কম্পিউটার তৈরি করেন যার ইনপুট, আউটপুট এবং মেমরি ইউনিট ছিল। এটি ছিল বাণিজ্যিকভাবে প্রস্তুতকৃত প্রথম ইলেকট্রনিক কম্পিউটার।
১৯৫৪ সালে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের IBM (International Business Machine) প্রতিষ্ঠানটি “IBM-701” নামে একটি কম্পিউটার তৈরি করে এবং বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করে।
বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন ১৯৬৪ সালে ঢাকায় প্রথম কম্পিউটার স্থাপন করে। এটি ছিল “IBM-1620” মেইনফ্রেম কম্পিউটার। পরবর্তীতে বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট), বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো, পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট বোর্ড তাদের ব্যবহারের জন্য মেইনফ্রেম কম্পিউটার স্থাপন করে।
১৯৭১ সালে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইন্টেল কোম্পানি “MSC-4 মাইক্রোপ্রসেসর” তৈরি করে এবং মাইক্রোকম্পিউটার প্রস্তুত করে। পরবর্তীতে এই মাইক্রোকম্পিউটারের ক্রমবিকাশ এবং বাণিজ্যিক সহজলভ্যতার কারণে, বর্তমানে আমরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, অফিস এবং বাড়িতে মাইক্রো কম্পিউটারের ব্যবহার দেখতে পাচ্ছি।
কম্পিউটারের প্রজন্ম:
কম্পিউটারকে নিম্নলিখিত চারটি প্রজন্মে ভাগ করা যায়:
প্রথম প্রজন্ম (১৯৫১-১৯৫৮):
বৈশিষ্ট্য: এখানে ভ্যাকুয়াম টিউব বা ভ্যাকুয়াম ভালভের ব্যবহার করা হয়েছে, আকারে বড়, প্রোগ্রাম করা যেত এবং তথ্য সংরক্ষণ করার ক্ষমতা ছিল। ম্যাগনেটিক ড্রাম, পাঞ্চ কার্ড এবং ম্যাগনেটিক টেপের ব্যবহার ছিল। উদাহরণ: ENIAC, MARK, IBM-650।
২য় প্রজন্ম (১৯৫৮-১৯৬৫):
বৈশিষ্ট্য: এই প্রজন্মের কম্পিউটারগুলিতে IC (Integrated Circuit) ব্যবহার করা হয়েছে, ট্রানজিস্টর ছিল যার মূল ভিত্তি। আকারে প্রথম প্রজন্মের তুলনায় ছোট, ACCII (American Standard Code for Information Interchange) কোড প্রবর্তন হয় এই প্রজন্মে। COBOL, FORTRAN, ALGOL এর মতো উচ্চ-স্তরের ভাষার ব্যবহার শুরু হয়। উদাহরণ: IBM-1620, CDC-1604, NCR-300।
৩য় প্রজন্ম (১৯৬৫-১৯৭১):
বৈশিষ্ট্য: ইনপুট ডিভাইস হিসাবে মাউস পরিচিতি লাভ করে। আকারে ছোট এবং দাম হ্রাস পায়। আউটপুট ডিভাইস হিসাবে ভিডিও ইউনিট এবং প্রিন্টারের প্রবর্তন হয় এই প্রজন্মে। সেকেন্ডারি মেমরির ব্যবহার, BASIC ভাষার উদ্ভাবন, শব্দ প্রক্রিয়করণ এবং অন্যান্য অ্যাপ্লিকেশনের ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। উদাহরণ: IBM-370, PDP-II।
৪র্থ প্রজন্ম (১৯৭১ – আজ পর্যন্ত):
বৈশিষ্ট্য: এই প্রজন্মে মাইক্রোপ্রসেসরের উদ্ভাবন ও ব্যবহার শুরু হয়। সেমি-কন্ডাক্টর মেমরি, ROM, RAM, PROM, EPROM পরিচিতি লাভ করে। তথ্য সংরক্ষণের উচ্চ ক্ষমতা, DOS, Mac, Windows এবং UNIX এর মতো অপারেটিং সিস্টেমের বিকাশ ঘটে। বিভিন্ন অ্যাপ্লিকেশন সফটওয়্যার এবং প্রোগ্রামিং ভাষার ব্যাপক ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। উন্নত সুপার কম্পিউটার, ল্যাপটপ, নোটবুক, ডেস্কটপ এবং পার্সোনাল কম্পিউটারের উৎপত্তি হয় প্রতি নিয়ত। উদাহরণ: বিভিন্ন ব্র্যান্ডের পিসি এবং ল্যাপটপ যেমন: IBM, Compaq, HP, Sun, DELL, ACER।
উপসংহার:
কম্পিউটার ক্রমবিকাশের ইতিহাস মানবসভ্যতার প্রযুক্তিগত অগ্রগতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। প্রাচীন গণনাযন্ত্র থেকে শুরু করে বর্তমান আধুনিক ডিজিটাল কম্পিউটার পর্যন্ত কম্পিউটার বহু ধাপে উন্নত হয়েছে। অ্যাবাকাস, প্যাসক্যালাইন, ডিফারেন্স ইঞ্জিন, অ্যানালিটিক্যাল ইঞ্জিন এবং পরবর্তীতে ইলেকট্রনিক কম্পিউটারের আবিষ্কার কম্পিউটার প্রযুক্তিকে ধীরে ধীরে আধুনিক রূপ দিয়েছে।
কম্পিউটারের বিভিন্ন প্রজন্মের মাধ্যমে এর আকার, গতি, ক্ষমতা, নির্ভরযোগ্যতা এবং ব্যবহারযোগ্যতা ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়েছে। ভ্যাকুয়াম টিউব থেকে ট্রানজিস্টর, ইন্টিগ্রেটেড সার্কিট, মাইক্রোপ্রসেসর এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তি—প্রতিটি ধাপ কম্পিউটারকে আরও উন্নত, দ্রুত ও কার্যকর করেছে।
সুতরাং বলা যায়, কম্পিউটারের ক্রমবিকাশ ও প্রজন্ম সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করলে আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির ভিত্তি, বর্তমান ব্যবহার এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়। বর্তমান যুগে শিক্ষা, ব্যাংকিং, চিকিৎসা, ব্যবসা, গবেষণা ও যোগাযোগসহ প্রায় সব ক্ষেত্রে কম্পিউটার অপরিহার্য ভূমিকা পালন করছে।
